আন নিসা ৩৫-৫৪

পৃষ্ঠা নং-২৪৯

আনুগত্যের সাথে যুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ (أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ) অর্থাৎ, আমার এবং তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর।

হযরত মা’আয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, রসূলে কারীম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দশটি অসিয়্যত করেছিলেন। তন্মধ্যে-(১) আল্লাহ্ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদি তোমাদেরকে সেজন্য হত্যা কিংবা অগ্নিদগ্ধও করা হয়। (২) নিজের পিতা-মাতার নাফরমানী কিংবা তাদের মনে কষ্ট দেবে না, যদি তারা এমন নির্দেশও দিয়ে দেন যে, তোমরা তোমাদের পরিবার পরিজন ও ধন-সম্পদ ত্যাগ কর।–(মুসনাদে আহমদ)

রসূলে করীম (সাঃ)-এর বাণীসমূহে যেমন পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাকিদ রয়েছে, তেমনিভাবে তার সীমাহীন ফযীলত, মর্তবা ও সওয়াবের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, মহানবী (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোক নিজের রিযিক ও আয়ূতে বরকত কামনা করবে, তার পক্ষে সেলায়ে-রেহ্‌মী অর্থাৎ, নিজের আত্মীয়-স্বজনের হকসমূহ আদায় করা উচিত।

তিরমিযী শরীফের এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে যে, আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহ্‌র অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

শুআবুল ঈমান গ্রন্থে হযরত বায়হাকী (রহঃ) রেওয়ায়েত করেছেন যে, রসূলে কারীম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, যে পুত্র স্বীয় পিতা-মাতার অনুগত, সে যখনই নিজের পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও মহব্বতের দৃষ্টিতে তাকায়, তখন প্রতিটি দৃষ্টিতে সে একটি করে মকবুল হজ্বের সওয়াব প্রাপ্ত হয়।

বায়হাকীর অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে যে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, সমস্ত গোনাহ্ আল্লাহ্ তাআলা ক্ষমা করে দেন, কিন্তু যে লোক পিতা-মাতার নাফরমানী এবং তাঁদের মনে কষ্টদায়ক কাজ করে, তাকে আখেরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই বিভিন্ন বিপদাপদে লিপ্ত করে দেয়া হয়।

নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহারের তাকীদঃ উল্লেখিত আয়াতে পিতা-মাতার পর পরই সাধারণ (ذِي ٱلْقُرْبَىٰ) অর্থাৎ, -সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদ দেয়া হয়েছে। কুরআন-কারীমের প্রসিদ্ধ এক আয়াতে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যা হুযূর (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রায়শঃই বিভিন্ন ভাষণের পর তিলাওয়াত করতেন। বলা হয়েছে- (إِنَّ ٱللَّهَ يَأْمُرُ بِٱلْعَدْلِ وَٱلإحْسَانِ وَإِيتَآءِ ذِي ٱلْقُرْبَىٰ)

অর্থাৎ, “আল্লাহ্ সবার সাথে ন্যায় ও সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন এবং নির্দেশ দিচ্ছেন আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করার জন্য।” এতে সামর্থ্যানুযায়ী আত্মীয়-আপনজনদের কায়িক ও আর্থিক সেবা-যত্ন করা, তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা এবং তাঁদের খবরা-খবর নেয়াও অন্তর্ভুক্ত।

হযরত সালমান ইবনে ‘আমের (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন যে, সদকার মাল সাধারণ গরীব-মিসকীনকে দান করলে তাতে তো শুধু সদকার সওয়াবই পাওয়া যায়, অথচ তা যদি নিজের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়-আপনজনকে দান করা হয়, তাহলে তাতে দু’টি সওয়াব পাওয়া যায়। একটি হল সদকার সওয়াব এবং আরেকটি হল সেলায়ে-রেহ্‌মীর সওয়াব। অর্থাৎ, আত্মীয়তার হক আদায় করার সওয়াব।–(মুসনাদে আহমদ, নাসাঈ, তিরমিযী)

উল্লেখিত আয়াতে প্রথমে পিতা-মাতার হকের ব্যাপারে তাকীদ দেয়া হয়েছে এবং তারপরেই আত্মীয়-স্বজনের হকের কথা বলা হয়েছে।

এতীম-মিসকীনের হকঃ তৃতীয় পর্যায়ে ইরশাদ হয়েছে – (وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ) এতীম ও মিসকীনদের হক সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ যদিও সূরার প্রথমভাগে এসে গেছে, কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের হক বর্ণনা প্রসঙ্গে এখানে তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, লা-ওয়ারিস তথা অনাথ শিশু এবং অসহায় মানুষের সাহায্য-সহায়তাকেও এমনি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী বিবেচনা করবে, যেমন আত্মীয়-আপনজনদের বেলায় করে থাক।

প্রতিবেশীর হকঃ চতুর্থ পর্যায়ে বলা হয়েছে (وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ) (এবং নিকট প্রতিবেশীর)-পঞ্চম আয়াতে বলা হয়েছে – (وَالْجَارِ الْجُنُبِ)- وَالْجَارِ الْجُنُبِ শব্দের অর্থ প্রতিবেশী। এ আয়াতে দু’রকম প্রতিবেশীর কথা বলা হয়েছে।

(১) (جَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ) (২) (جَارِ الْجُنُبِ) এতদুভয় প্রকার প্রতিবেশীর বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, (جَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ) বলতে সেসব প্রতিবেশীকে বোঝায়, যারা প্রতিবেশী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়ও বটে। এভাবে এতে দু’টি হক সমন্বিত হয়ে যায়। আর (جَارِ الْجُنُبِ) বলতে শুধুমাত্র সে প্রতিবেশীকে বোঝায় যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। আর সে জন্যই তার উল্লেখ করা হয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ে।

কোন কোন তাফসীরকার মনীষী বলেছেন, ‘জারে-যিলকোরবা’ এমন প্রতিবেশীকে বলা হয়, যে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং মুসলমান। আর ‘জারে-জুনুব’ বলা হয় অমুসলমান প্রতিবেশীকে।

কুরআনে ব্যবহৃত শব্দে অবশ্য এসমুদয় সম্ভাব্যতাই বিদ্যমান। তাছাড়া বাস্তবতার দিক দিয়েও প্রতিবেশীদের মাঝে স্তরভেদ থাকাটা একান্তই যুক্তিসঙ্গত এবং নির্ভরযোগ্যও বটে। আর প্রতিবেশীদের আত্মীয় অথবা অনাত্মীয় হওয়ার দিক দিয়েও। প্রতিবেশী চাই নিকটবর্তী হোক অথবা দূরবর্তী, আত্মীয় হোক অথবা অনাত্মীয়, মুসলমান হোক অথবা অমুসলমান, যে কোন অবস্থায় সাধ্যানুযায়ী তাদের সাহায্য-সহায়তা করা ও তাদের খবরা-খবর নেয়া কর্তব্য।

অবশ্য প্রতিবেশী হওয়া ছাড়াও যার অন্যান্য হক রয়েছে, অন্যান্য প্রতিবেশীদের তুলনায় তাকে মর্যাদাগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, স্বয়ং হুযূরে আকরাম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, “কোন কোন প্রতিবেশী রয়েছে, যাদের হক মাত্র একটি, কোন কোন প্রতিবেশী রয়েছে যাদের হক দু’টি এবং কোন কোন প্রতিবেশী রয়েছে যাদের হক তিনটি। এক হকবিশিষ্ট প্রতিবেশী হল এমন অমুসলমান যাদের সাথে কোন আত্মীয়তা নেই। দুই হকবিশিষ্ট –