আন নিসা ৫৫-৭৫

পৃষ্ঠা নং-২৬৪

গভীর ভালবাসা রয়েছে তাঁরা হাশরের মাঠেও হুযূরের সাথে থাকবেন।

রসূলে কারীম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সান্নিধ্য লাভ কোন বর্ণ-গোত্রের উপর নির্ভরশীল নয়ঃ তিব্‌রানী (রহঃ) জামে কবীর গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর এ রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করেছেন যে, জনৈক হাবশী ব্যক্তি মহানবী (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে এসে নিবেদন করলেন,- “ইয়া রসূলুল্লাহ্! আপনি আমাদের চাইতে আকার-আকৃতি, রং উভয় দিক দিয়েই সুন্দর ও অনন্য এবং নবুওয়াতের দিক দিয়েও। এখন যদি আমি এ ব্যাপারেও ঈমান নিয়ে আসি, যাতে আপনার ঈমান রয়েছে এবং সেরূপ আমলও করি, যা আপনি করে থাকেন, তাহলে কি আমিও জান্নাতের মাঝে আপনার সাথে থাকতে পারব।”

মহানবী (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “হ্যঁ, অবশ্যই। তুমি তোমার হাবশীসুলভ কদাকৃতির জন্য চিন্তিত হয়ো না। সে সত্তার কসম, যাঁর মুঠোয় আমার প্রাণ, জান্নাতের মাঝে কাল রংয়ের হাবশীও সাদা ও সুন্দর হয়ে যাবে এবং এক হাজার বছরের দূরত্বে থেকেও চমকাতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ (কালিমাহ-য়) বিশ্বাসী হবে, তার মুক্তি ও কল্যাণ আল্লাহ্‌র দায়িত্বে এসে যায়। আর যে লোক ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ পড়ে, তার আমলনামায় একলক্ষ চব্বিশ হাজার নেকী লেখা হয়”।

সিদ্দীক-এর সংজ্ঞাঃ দ্বিতীয় স্তর হল সিদ্দীকীনের। আর সিদ্দীক হলেন সে সমস্ত লোক যাঁরা মা’রেফত বা আল্লাহ্‌ তাআলার পরিচয় লাভের ক্ষেত্রে নবীগণের কাছাকাছি। এর উদাহরণ এই যে, কোন লোক যেন কোন বস্তুকে দূর থেকে অবলোকন করছে। হযরত আলী (রদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর নিকট কোন এক লোক জিজ্ঞেস করলেন যে, “আপনি কি আল্লাহ্ তাআলাকে দেখেছেন?” তিনি বলেছিলেন, “আমি এমন কিছুর ইবাদত করতে পারি না, যা আমি দেখিনি।” অতঃপর আরো বললেন,- “আল্লাহ্‌কে মানুষ স্বচক্ষে দেখেনি সত্য, কিন্তু মানুষের অন্তর ঈমানের আলোকে তাঁকে উপলব্ধি করে নেয়।” এখানে ‘দেখা’ বলতে হযরত আলী (রদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর উদ্দেশ্য হল স্বীয় জ্ঞানের গভীরতা সুক্ষ্মতার মাধ্যমে দেখার মতই উপলব্ধি করে নেয়া।

শহীদের সংজ্ঞাঃ তৃতীয় স্তর হল শহীদগণের। আর শহীদ হলেন সে সমস্ত লোক, যাঁরা বিভিন্ন যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হন; তাঁরা তা প্রত্যক্ষ করেন না। তাঁদের উদাহরণ হল এমন, যেন কোন লোক কোন বস্তুকে আয়নার কাছ থেকে অবলোকন করছে। যেমন, হযরত হারেসা (রদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেছেন, “আমার মনে হয় আমি যেন আমার মহান পরওয়ারদেগারের আরশ প্রত্যক্ষ করছি।”

তাছাড়া أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ হাদীসটিতেও এমন ধরনের দেখার কথা বলা হয়েছে।

সালেহীনের সংজ্ঞাঃ চতুর্থ স্তর হল সালেহীনদের। যাঁরা নিজেদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্যকে অনুসরণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে নিশ্চিত জেনে নেন। তাদের উদাহরণ হলো, কোন বস্তুকে দূর থেকে আয়নার মধ্যে দেখা। আর হাদীসে فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ যে বলা হয়েছে, তাতেও দেখা বা প্রত্যক্ষ করার এই স্তরের কথাই বোঝানো হয়েছে। ইমাম রাগেব ইস্পাহানীর এই পর্যালোচনার সার-নির্যাস হচ্ছে, এগুলোই হল ‘মা’রেফতে-রব’ বা আল্লাহ্ তাআলার পরিচয় লাভের স্তর। বস্তুতঃ এই মা’রেফতের স্তরের পার্থক্যহেতু মর্যাদাও বিভিন্ন। যাহোক, আয়াতের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। এতে মুসলমানদিগকে এই সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের পরিপূর্ণ আনুগত্যশীল অনুসারীগণ তাঁদেরই সাথে থাকবে যাঁরা অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। হে পরওয়ারদেগার! তুমি আমাদের সবাইকে তোমার এমনি ভালবাসা লাভের তাওফীক দান কর। আমীন।

কতিপয় অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞাতব্যঃ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ আয়াতের প্রথমাংশে জেহাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের এবং অতঃপর আয়াতের দ্বিতীয় অংশে জেহাদে অংশগ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে একটি বিষয় বোঝা যাচ্ছে এই যে, কোন ব্যাপারে বাহ্যিক উপকরণ অবলম্বন করা তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ্‌র উপর নির্ভরশীলতার পরিপন্থী নয়। এ বিষয়টি আরও কয়েক জায়গায় সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ বোঝা যাচ্ছে, এখানে অস্ত্র সংগ্রহের নির্দেশ দেয়া হলেও এমন প্রতিশ্রুতি কিন্তু দেয়া হয়নি যে, এ অস্ত্রের কারণে তোমরা নিশ্চিতভাবেই নিরাপদ হতে পারবে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, বাহ্যিক উপকরণ অবলম্বন করাটা মূলতঃ মানসিক স্বস্তিলাভের জন্যই হয়ে থাকে। বাস্তবে এগুলো লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে-

قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا

অর্থাৎ “হে নবী! আপনি বলে দিন, আমাদের উপর এমন কোন বিপদাপদই আসে না, যা আল্লাহ্ আমাদের তকদীর বা নিয়তিতে নির্ধারিত করে দেননি।”

১। এ আয়াতে প্রথমে জেহাদের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ অতঃপর জেহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সুশৃংখল নিয়ম বাতলে দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দু’টি বাক্য فَانفِرُوا ثُبَاتٍ أَوِ انفِرُوا جَمِيعًا ব্যবহার করা হয়েছে। ثبة শব্দটি ثُبَاتٍ এর বহুবচন। এর অর্থ ক্ষুদ্র দল। অর্থাৎ, তোমরা যখন জেহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে, তখন একা একা বেরোবে না, বরং ছোট ছোট দলে বেরোবে কিংবা (সম্মিলিত) বড় সৈন্যদল নিয়ে বেরোবে। তার কারণ, একা একা যুদ্ধ করতে গেলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। শত্রুরা এমন সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে মোটেই শৈথিল্য করে না।

উৎপীড়িতের সাহায্য করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরযঃ মক্কা নগরীতে এমন কিছু দুর্বল মুসলমান রয়ে গিয়েছিলেন, যারা দৈহিক দুর্বলতা এবং আর্থিক দৈন্যের কারণে হিজরত করতে পারছিলেন না। পরে কাফেররাও তাদেরকে হিজরত করতে বাধাদান করছিল এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতে আরম্ভ করেছিল, যাতে তারা ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এদের কারো কারো নামও তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, হযরত ইবনে আব্বাস ও তাঁর মাতা, সালমা ইবনে হেশাম, ওলীদ ইবনে ওলীদ, আবু জান্‌দাল ইবনে সাহ্‌ল প্রমুখ।–(কুরতুবী) এসব সাহাবী নিজেদের ঈমানী বলিষ্ঠতার দরুন কাফেরদের অসহনীয়-উৎপীড়ন সহ্য করেও ঈমানের উপর স্থির থাকেন। অবশ্য তাঁরা এসব অত্যাচার উৎপীড়ন থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য বরাবরই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দরবারে মোনাজাত করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাআলা তাঁদের সে প্রার্থনা মঞ্জুর করে নেন এবং মুসলমানদিগকে নির্দেশ দেন, যাতে তাঁরা জেহাদের মাধ্যমে সেই নিপীড়িতদেরকে কাফেরদের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেন।

এ আয়াতে বোঝা যায়, মুমিনরা আল্লাহ্ তাআলার দরবারে দু’টি বিষয়ের দু‘আ করেছিলেন। একটি হলো এই যে, আমাদিগকে এই (মক্কা)-