আলি ইমরান ১-২৯

পৃষ্ঠা নং-১৬৪

সংখ্যক লোকের এক বিষয়ে একমত হওয়াই বিষয়টির সত্যতা নিরুপণের জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু পয়গম্বরগণের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, তাঁদের সততা ও সাধুতার উচ্চতম মাপকাঠির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কারও পক্ষে এরূপ বিশ্বাস করা ছাড়া গত্যন্তর নেই যে, তাঁদের বাণী ষোল আনাই সত্য এবং তাঁদের দা’ওয়াতে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জগতেরই মঙ্গল নিহিত।

          প্রথম দিকের দুই আয়াতে বর্ণিত তাও‘হীদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিভিন্ন ‘হাদীসে বলা হয়েছে যে, -কিছু সংখ্যক খ্রীষ্টান একবার হুযুর (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ধর্মীয় আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়। তিনি আল্লাহ্‌র নির্দেশে তাদের সামনে তাও‘হীদের দু-একটি প্রমাণ উপস্থিত করলে খ্রীষ্টানরা নিরুত্তর হয়ে যায়।

          তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতেও তাওহী‘দের বিষয়বস্তু বিধৃত হয়েছে। তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ্‌ তা‘আলার সর্বব্যাপী জ্ঞানের বর্ণনা রয়েছে যে, এ জ্ঞান থেকে কোন জাহানের কোন কিছু গোপন নয়।

          চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ্‌ তা‘আলার পরিপূর্ণ শক্তি এবং সর্ববিষয়ে সার্বিক সামর্থ্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি মানুষকে জননীর উদরে তিনটি অন্ধকার পর্যায়ে কিরূপ নিপুণভাবে গঠন করেছেন। তাদের আকার-আকৃতি ও বর্ণ বিন্যাসে এমন শিল্পীসুলভ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন যে, আকৃতি ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে একজনের আকার-আকৃতি অন্যজনের সাথে এমন মিল খায় না যে, স্বতন্ত্র পরিচয় দুরুহ হয়ে পড়ে। এহেন সর্বব্যাপী জ্ঞান ও পরিপূর্ণ শক্তি-সামর্থ্যের যুক্তিসঙ্গত দাবী এই যে, উপাসনা একমাত্র তাঁরই করতে হবে। তিনি ছাড়া আর কারো জ্ঞান ও শক্তি-সামর্থ্য এরূপ নয়। কাজেই অন্য কেই উপাসনার যোগ্যও নয়।

          এভাবে তাও‘হীদ সপ্রমাণ করার জন্যে আল্লাহ্‌ তা‘আলার প্রধান চারটি ‘সিফাত’  (গুণ) চারটি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতে চিরঞ্জীব ও সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী হওয়ার সিফাত বা গুণ এবং তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ আয়াত পর্যন্ত সর্বব্যাপী জ্ঞান ও সার্বিক শক্তি-সামর্থ্যের সিফাত বর্ণিত হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, এ চারটি গুণেই যে সত্তা গুণান্বিত, তিনিই একমাত্র উপাসনার যগ্য।

          আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্‌ তা‘আলা খ্রীষ্টানদের বিভ্রান্তিকর মন্তব্যের মূলোৎপাটন করেছেন। এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, কুরআনের এসব বাক্য ‘মুতাশাবিহাত’ অর্থাৎ, রূপক। এসব বাক্যের বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়। এগুলো আল্লাহ্‌ তা‘আলা ও তাঁর রসূলের (সল্লাল্ল-গু ‘আলাইগি ওয়া সাল্লাম) মধ্যকার একটা গোপন রহস্য। এগুলোর প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে রব সাধারণ অবগত হতে পারে না, বরং এসব শব্দের তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওয়া সাধারণ মানুষের জন্যে বৈধ নয়। এগুলো সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন করা জরুরী যে, এসব বাক্য দ্বারা আল্লাহ্‌ তা‘আলার যা উদ্দেশ্য, তা সত্য। এর অতিরিক্ত ঘাটা-ঘাটি করার অনুমতি নেই।

          প্রথম আয়াতে আল্লাহ্‌ তা‘আলা কুরআনের সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট বা রূপক আয়াতের কথা উল্লেখ করে একটি সাধারণ মূলনীতি ও নিয়মের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এ মূলনীতিটি বুঝে নেয়ার পর অনেক আপত্তি ও বাদানুবাদের অবসান ঘটে। এর ব্যাখ্যা এরূপঃ কুরআন মাজীদে দুই প্রকার আয়াত রয়েছে। এক প্রকারকে ‘মুহকামাত’ তথা সুস্পষ্ট আয়াত এবং অপর প্রকারকে ‘মুতাশাবিহাত’ তথা অস্পষ্ট ও রূপক আয়াত বলা হয়।

          ‘আরবী ভাষার নিয়মাবলী সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ব্যক্তি যেসব আয়াতের অর্থ সুস্পষ্টরূপে বুঝতে পারে, সেসব আয়াতকে মু‘হকামাত বলে এবং এরূপ ব্যক্তি যেসব আয়াতের অর্থ স্পষ্টরূপে বুঝতে সক্ষম না হয়, সেসব আয়াতকে মুতাশাবিহাত বলে। (মাযহারী, ২য় খন্ড)

          প্রথম প্রকার আয়াতকে আল্লাহ্‌ তা‘আলা ‘উম্মুল কিতাব’ আখ্যা দিয়েছেন। এর অর্থ এই যে, এসব আয়াতই সমগ্র শিক্ষার মূল ভিত্তি। এসব আয়াতের অর্থ যাবতীয় অস্পষ্টতা ও জটিলতা মুক্ত।

          দ্বিতীয় প্রকার আয়াতে বক্তার উদ্দেশ্য; অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট হওয়ার কারণে এগুলো সম্পর্কে বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, এসব আয়াতকে প্রথম প্রকার আয়াতের আলোকে দেখতে হবে। যে অর্থ প্রথম প্রকার আয়াতের বিপক্ষে যায়, তাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে বক্তার এমন উদ্দেশ্য বুঝতে হবে, যা প্রথম প্রকার আয়াতের বিপক্ষে নয়। এ ব্যাপারে স্বীকৃত মুলনীতি কিংবা কোন ব্যাখ্যা অথবা, কদর্থ করা বৈধ নয়। উদাহরণতঃ হযরত ‘ঈসা (‘আলাইহিচ্ছালাম) সম্পর্কে কুরআনের সুস্পষ্ট উক্তি এরূপ إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدٌ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ (সে আমার নেয়ামতপ্রাপ্ত বান্দা ছাড়া অন্য কেউ নয়)। অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ ۖ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ

          অর্থাৎ, -আল্লাহ্‌র কাছে ‘ঈসার উদাহরণ হচ্ছে আদমের অনুরূপ। আল্লাহ্‌ তাকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা থেকে।

          এসব আয়াত এবং এই ধরনের অন্যান্য আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ‘ঈসা (‘আলাইহিচ্ছালাম) আল্লাহ্‌ তা‘আলার মনোনীত বান্দা এবং তাঁর সৃষ্ট। অতএব ‘তিনি উপাস্য, তিনি আল্লাহ্‌র পুত্র’ –খ্রীষ্টানদের এসব দাবী সম্পূর্ণ বানোয়াট।

          এখন যদি কেউ এসব সুস্পষ্ট প্রমাণ থেকে চোখ বন্ধ করে শুধু ‘আল্লাহ্‌র বাক্য’ এবং ‘আল্লাহ্‌র আত্মা’ ইত্যাদি অস্পষ্ট আয়াত সম্বল করে হঠকারিতা শুরু করে দেয় এবং এগুলোর এমন অর্থ নেয়, যা সুস্পষ্ট আয়াত ও পরস্পরাগত বর্ণনার বিপরীত, তবে একে তার বক্রতা ও হঠকারিতা ছাড়া আর কি বলা যায়?

          কারণ, অস্পষ্ট আয়াতসমূহের নির্ভুল উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ্‌ তা‘আলাই জানেন। তিনিই কৃপা ও অনুগ্রহপুর্বক যাকে যতটুকু ইচ্ছা জানিয়ে দেন। সুতরাং এমন অস্পষ্ট আয়াত থেকে কষ্টকল্পনার আশ্রয় নিয়ে স্বমতের অনুকূলে কোন অর্থ বের করা শুদ্ধ হবে না।

          فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ- এ আয়াতে আল্লাহ্‌ তাআলা বর্ণনা করেন যে, যারা সুস্থ স্বভাব-সম্পন্ন তারা অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে বেশী তথ্যানুসন্ধান ও ঘাটাঘাটি করে না; বরং তাঁরা সংক্ষেপে বিশ্বাস করে যে, এ আয়াতটিও আল্লাহ্‌র সত্য কালাম। তবে তিনি কোন বিশেষ হেকমতের কারণে এর অর্থ সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেননি প্রকৃতপক্ষে এ পন্থাই বিপদমুক্ত ও সতর্কতাযুক্ত। এর বিপরীতে কিছুসংখ্যক লোক এমনও আছে, যাদের অন্তর বক্রতাযুক্ত। তারা সুস্পষ্ট আয়াত থেকে চক্ষু বন্ধ করে অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিতে লিপ্ত থাকে এবং তা থেকে নিজ মতলবের অনুকূলে অর্থ বের করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস পায়। এরূপ লোকদের সম্পর্কে কুরআন ও ‘হাদীসে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে।