আলি ইমরান ১-২৯

পৃষ্ঠা নং-১৬৫

وَالرّٰسِخُوْنَ فِی الْعِلْمِ یَقُوْلُوْنَ اٰمَنَّا بِهٖ ۙ  -‘জ্ঞানে গভীরতার অধিকারি’ কারা? এ সম্পর্কে আলেমগণের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। অধিকতর গ্রহনযোগ্য উক্তি এই যে, এরা হলেন আহলুস সুন্নাত-ওয়াল-জামা‘আত তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহর সে ব্যাখ্যাই বিশুদ্ধ মনে করেন, যা সাহাবায়ে কেরাম, পূর্ববর্তী মনীষীবৃন্দ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ইজমায় বর্ণীত রয়েছে। তাঁরা সুস্পষ্ট আয়াতসমূহকে কুরআনী শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন এবং অস্পষ্ট আয়াতসমূহের যেসব অর্থ তাঁদের বোধগম্য নয়, নিজেদের জ্ঞানের দৈন্য স্বীকার করে সেগুলোকে তাঁরা আল্লাহ্‌র নিকটই সোপর্দ করেন। তাঁরা স্বীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ঈমানী শক্তির জন্য গর্বিত নন, বরং সর্বদা আল্লাহ্‌র কাছে দৃঢ়তা ও অধিকতর জ্ঞান-গরিমা ও অন্তর-দৃষ্টি কামনা করতে থাকেন। তাঁদের মন-মস্তিস্ক অস্পষ্ট আয়াতসমূহের পেছনে পড়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে উৎসাহী নয়। তাঁরা সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট উভয় প্রকার আয়াতকে সত্য মনে করেন। কারণ তাঁদের বিশ্বাস এই যে, উভয় প্রকার আয়াত একই উৎস থেকে আগত। তবে এক প্রকার, অর্থাৎ সুস্পষ্ট আয়াতের অর্থ জানা আমাদের জন্যে উপকারী ও জরুরী ছিল, এজন্যে আল্লাহ্ তা‘আলা তা গোপন রাখেননি, বরং খোলাখুলি বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং অন্য প্রকার অর্থাৎ অস্পষ্ট আয়াতের অর্থ আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ হেকমতের কারণে বর্ণনা করেননি। কাজেই তা জানা আমাদের জন্য জরুরী নয়। সংক্ষেপে এরূপ আয়াতে বিশ্বাস স্থাপন করাই যথেষ্ট। -(মাযহারী)

প্রথম আয়াত দ্বারা জানা যায় যে, পথ-প্রদর্শন ও পথভ্রষ্টটা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহ্‌ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তাঁর অন্তরকে সৎকাজের দিকে আকৃষ্ট করে দেন। আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান। তাঁর অন্তরকে সোজাপথ থেকে বিচ্যুত করে দেন।

রসূল (সাঃ) বলেনঃ এমন কোন অন্তর নেই যা আল্লাহ্‌ তায়ালার দুই আঙ্গুলীর মাঝখানে নয়। তিনি যতক্ষন ইচ্ছা করেন তাকে সৎপথে কায়েম রাখেন এবং যখন ইচ্ছা করেন, সৎপথ থেকে বিচ্যুত করে দেন।

তিনি যথেষ্ট ক্ষমতাশীল। যা ইচ্ছা তাই করেন। কাজেই, যারা ধর্মের পথে কায়েম থাকতে চায়, তাঁরা সর্বদাই আল্লাহ্‌র নিকট অধিকতর দৃঢ়চিত্ততা প্রদানের জন্যে দু‘আ করে। হুযুর (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বদাই অনুরূপ দু‘আ করতেন। এক ‘হাদীসে রসুলুল্ল-হ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিম্নরূপ একটি দু‘আ বর্ণিত হয়েছে, يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ অর্থাৎ হে, অন্তর আবর্তনকারী আমাদের অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর দৃঢ় রাখ।– (মাযহারী, ২য় খন্ড)

رَبَّنَآ إِنَّكَ جَامِعُ ٱلنَّاسِ لِيَوۡمٖ لَّا رَيۡبَ فِيهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُخۡلِفُ ٱلۡمِيعَادَ ٩

৯. হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি মানুষকে একদিন অবশ্যই একত্রিত করবেঃ এতে কোনই সন্দেহ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ওয়াদার অন্যথা করেন না।

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَن تُغۡنِيَ عَنۡهُمۡ أَمۡوَٰلُهُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُهُم مِّنَ ٱللَّهِ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمۡ وَقُودُ ٱلنَّارِ ١٠

১০. যারা কুফুরী করে, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর সামনে কখনও কাজে আসবে না। আর তারাই হচ্ছে দোযখের ইন্ধন।

كَدَأۡبِ ءَالِ فِرۡعَوۡنَ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡۚ كَذَّبُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَا فَأَخَذَهُمُ ٱللَّهُ بِذُنُوبِهِمۡۗ وَٱللَّهُ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ١١

১১. ফেরআউনের সম্প্রদায় এবং তাদের পূর্ববর্তীদের ধারা অনুযায়ীই তারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। ফলে তাদের পাপের কারণে আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করেছেন আর আল্লাহর আযাব অতি কঠিন।

قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُواْ سَتُغۡلَبُونَ وَتُحۡشَرُونَ إِلَىٰ جَهَنَّمَۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمِهَادُ ١٢

১২. কাফেরদিগকে বলে দিন, খুব শিগগীরই তোমরা পরাভূত হয়ে দোযখের দিকে হাঁকিয়ে নীত হবে-সেটা কতই না নিকৃষ্টতম অবস্থান।

قَدۡ كَانَ لَكُمۡ ءَايَةٞ فِي فِئَتَيۡنِ ٱلۡتَقَتَاۖ فِئَةٞ تُقَٰتِلُ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَأُخۡرَىٰ كَافِرَةٞ يَرَوۡنَهُم مِّثۡلَيۡهِمۡ رَأۡيَ ٱلۡعَيۡنِۚ وَٱللَّهُ يُؤَيِّدُ بِنَصۡرِهِۦ مَن يَشَآءُۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَعِبۡرَةٗ لِّأُوْلِي ٱلۡأَبۡصَٰرِ ١٣

১৩. নিশ্চয়ই দুটো দলের মোকাবিলার মধ্যে তোমাদের জন্য নিদর্শন ছিল। একটি দল আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করে। আর অপর দল ছিল কাফেরদের এরা স্বচক্ষে তাদেরকে দ্বিগুন দেখছিল। আর আল্লাহ যাকে নিজের সাহায্যের মাধ্যমে শক্তি দান করেন। এরই মধ্যে শিক্ষনীয় রয়েছে দৃষ্টি সম্পন্নদের জন্য।

زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ ٱلشَّهَوَٰتِ مِنَ ٱلنِّسَآءِ وَٱلۡبَنِينَ وَٱلۡقَنَٰطِيرِ ٱلۡمُقَنطَرَةِ مِنَ ٱلذَّهَبِ وَٱلۡفِضَّةِ وَٱلۡخَيۡلِ ٱلۡمُسَوَّمَةِ وَٱلۡأَنۡعَٰمِ وَٱلۡحَرۡثِۗ ذَٰلِكَ مَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَٱللَّهُ عِندَهُۥ حُسۡنُ ٱلۡمَ‍َٔابِ ١٤

১৪. মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়।

۞قُلۡ أَؤُنَبِّئُكُم بِخَيۡرٖ مِّن ذَٰلِكُمۡۖ لِلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ عِندَ رَبِّهِمۡ جَنَّٰتٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَا وَأَزۡوَٰجٞ مُّطَهَّرَةٞ وَرِضۡوَٰنٞ مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ بَصِيرُۢ بِٱلۡعِبَادِ ١٥

১৫. বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এসবের চাইতেও উত্তম বিষয়ের সন্ধান বলবো?- যারা পরহেযগার, আল্লাহর নিকট তাদের জন্যে রয়েছে বেহেশত, যার তলদেশে প্রস্রবণ প্রবাহিত-তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আর রয়েছে পরিচ্ছন্ন সঙ্গিনীগণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি সুদৃষ্টি রাখেন।

আনুসাঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ

قُلْ لِّلَّذِیْنَ کَفَرُوْا سَتُغْلَبُوْنَ -এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, কাফেররা পরাজিত ও পরাভূত হবে। এতে কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, আমরা জগতের সব কাফেরকে পরাভূত দেখি না, এর কারণ কি? উত্তর এই যে, আয়াতে সারা জগতের কাফের বোঝানো হয়নি, বরং তখনকার মূশরিক ও ইহুদী জাতিকে বোঝানো হয়েছে। সেমতে মুশরিকদের হত্যা ও বন্দী করার মাধ্যমে এবং ইহুদীদেরকে হত্যা, বন্দী, জিযিয়া কর আরোপ এবং নির্বাসনের মাধ্যমে পরাজিত করা হয়েছিল।

আলোচ্য আয়াতে বদর যুদ্ধের অবস্থা বর্নিত হয়েছে। এ যুদ্ধে-