আলি ইমরান ১-২৯

পৃষ্ঠা নং- ১৬৭

অর্থাৎ, এসব বস্তু হচ্ছে পার্থিব জীবনে ব্যবহার করার জন্যে; মন বসাবার জন্যে নয়। আর আল্লাহ্‌র কাছে রয়েছে উত্তম ঠিকানা। অর্থাৎ, সেখানে চিরকাল থাকতে হবে এবং যার নেয়ামত ধ্বংস হবে না, হ্রাস পাবে না।

          ১৫ নং আয়াতে এ সম্পর্কিত আরও ব্যাখ্যা দান প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ যারা দুনিয়ার অসম্পূর্ণ ও ধ্বংসশীল নেয়ামতে মত্ত হয়ে পড়েছে, আপনি তাদের বলে দিন যে, আমি তোমাদের আরও উতকৃষ্টতর নেয়ামতের সন্ধান বলে দিচ্ছি। যারা আল্লাহ্‌কে ভয় করে এবং যারা আল্লাহ্‌র অনুগত, তারাই এ নেয়ামত পাবে। সে নেয়ামত হচ্ছে সবুজ বৃক্ষলতাপূর্ণ বেহেশত- যার তলদেশ দিয়ে নির্ঝরিণীসমূহ প্রবাহিত হবে। তাতে থাকবে সকল প্রকার আবিলমুক্ত পরিচ্ছন্ন সঙ্গিনিগণ এবং আল্লাহ্‌ তাআলার সন্তুষ্টি।

          পূর্ববর্তী আয়াতে দুনিয়ার ছয়টি প্রধান নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, রমণীকুল, সন্তান-সন্ততি, সোনা-রূপার ভান্ডার, উৎকৃষ্ট অশ্ব, পালিত জন্তু ও শস্যক্ষেত। এদের বিপরীতে পরকালের নেয়ামতরাজির মধ্যে বহ্যতঃ তিনটি বর্ণিত হয়েছে। প্রথম- জান্নাতের সবুজ কানন; দ্বিতীয়- পরিচ্ছন্ন সঙ্গিনীগণ এবং তৃতীয়- আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি। অবশিষ্টগুলোর মধ্যে সন্তান-সন্ততি উল্লেখ না করার কারণ এই যে, দুনিয়াতে দুই কারণে মানুষ সন্তান-সন্ততিকে ভালবাসে। প্রথমতঃ সন্তান-সন্ততি পিতার কাজকর্মে সাহায্য করে। দ্বিতীয়তঃ মৃত্যুর পর সন্তান-সন্ততি দ্বারা পিতার নামটুকু থেকে যেয়। কিন্তু পরকালে কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই এবং সেখানে মৃত্যুও নেই যে, কোন অভিভাবক অথবা উত্তরাধিকারীর প্রয়োজন হবে। এছাড়া দুনিয়াতে যার যত সন্তান-সন্ততি আছে, সে জান্নাতে তাদেরকে পাবে। পক্ষান্তরে দুনিয়ায় যার সন্তান নেই, প্রথমতঃ জান্নাতে তার মনে সন্তানের বাসনাই হবে না। আর কারও মনে বাসনা জাগ্রত হলে আল্লাহ্‌ তাকে তাও দান করবেন। তিরমিযীর এক হাদীসে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ কোন জান্নাতীর মনে সন্তানের বাসনা জাগ্রত হলে সন্তানের গর্ভাবস্থা, জন্মগ্রহণ ও বয়োপ্রাপ্তি মূহুর্তের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাবে এবং তার মনের বাসনা পূর্ণ করা হবে।

          এমনিভাবে জান্নাতে সোনা-রূপার উল্লেখ করা হয়নি। কারণ এই যে, দুনিয়াতে সোনা-রূপার বিনিময়ে দুনিয়ার আসবাবপত্র এবং প্রয়োজনীয় সবকিছুই যোগাড় করা যায়। কিন্তু পরকালে ক্রয়-বিক্রয়েরও প্রয়োজন হবে না এবং কোন কিছুর বিনিময়ও দিতে হবে না। বরং জান্নাতীর মন যখন যা চাইবে, তৎক্ষণাৎ তা সরবরাহ করা হবে। এছাড়া জান্নাতে সোনা-রূপার কোন অভাব নেই। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতে কোন কোন প্রাসাদের একটি ইট সোনার ও একটি ইট রূপার হবে। মোটকথা, পরকালের হিসাবে সোনা-রূপাকে কোন উল্লেখযোগ্য বস্তুই মনে করা হয়নি।

          এমনিভাবে দুনিয়াতে ঘোড়ার কাজ হলো বাহন হয়ে পথের দুরত্ব অতিক্রম করা। জান্নাতে সফর ও যানবাহন প্রভৃতি কোন কিছুই প্রয়োজন হবে না। সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, শুক্রবার দিন জান্নাতীদের আরোহণের জন্যে উৎকৃষ্ট ঘোড়া সরবরাহ করা হবে। এগুলোতে আরোহণ করে জান্নাতীরা আত্নীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা করতে যাবে।

          মোট কথা, জান্নাতে ঘোড়ারও কোন উল্লেখযোগ্য দুরত্ব নেই। এমনিভাবে পালিত পশু কৃষিক্ষেত্রে কাজে আসে অথবা তা দুগ্ধ দান করে। জান্নাতে দুগ্ধ ইত্যাদি পশুর মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহ্‌ তাআলা দান করবেন।

          কৃষিকাজের অবস্থাও তদ্রুপ। দুনিয়াতে বিভিন্ন শস্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে শস্যক্ষেত্রে পরিশ্রম করা হয়। জান্নাতে যাবতীয় শস্যই আপনা-আপনি সরবরাহ হবে। কাজেই সেখানে কৃষিকাজের প্রয়োজনই হবে না। তবুও যদি কেউ কৃষি কাজকে ভালবাসে, তবে তার জন্য সে ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। তিবরানীর এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, জান্নাতে একব্যক্তি কৃষিকাজের বাসনা প্রকাশ করবে। তাকে তৎক্ষণাৎ যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। অতঃপর শস্যের বপন, রোপন, পাকা ও কর্তন কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যাবে। এসব কারণেই জান্নাতের নেয়ামতসমূহের মধ্যে শুধু জান্নাত ও জান্নাতের হুরদের বর্ণনাকেই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। কারণ, জান্নাতীদের জন্যে কুরআনের ওয়াদাও রয়েছে যে, وَلَهُمْ مَّايَشْتَهُوْنَ অর্থাৎ, তারা যে বাসনাই প্রকাশ করবে, তাই পাবে। এহেন ব্যাপক ঘোষণার পর বিশেষ নেয়ামতের কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে কি? তা সত্ত্বেও কয়েকটি বিশেষ নেয়ামত উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো প্রত্যেক জান্নাতী চাওয়া ছাড়াই পাবে।  এগুলোর পর আরও একটি সর্ববৃহত নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সাধারণভাবে মানুষ যার কল্পনাও করে না। তা হচ্ছে আল্লাহ্‌ তাআলার অশেষ সন্তুষ্টি। হাদীসে বর্ণিত আছে, যখন জান্নাতিগণ জান্নাতে পৌঁছে আনন্দিত ও নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে এবং তাদের কোন আকাঙ্ক্ষাই অপূর্ণ থাকবে না, তখন আল্লাহ্‌ তাআলা স্বয়ং তাদের সম্বোধন করে বলবেনঃ এখন তোমরা সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত হয়েছে। আর কোন বস্তুর প্রয়োজন নেই তো? জান্নাতিগণ বলবেন? হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি এত নেয়ামত দান করেছেন যে, এরপর আর কোন নেয়ামতের প্রয়োজনই থাকতে পারে না। আল্লাহ্‌ তাআলা বলবেনঃ এখন আমি তোমাদের সব নেয়ামত থেকে উৎকৃষ্ট একটি নেয়ামত দিচ্ছি। তা এই যে, তোমরা সবাই আমার অশেষ সন্তুষ্টিলাভ করেছ। এখন অসন্তুষ্টির আর কোন আশঙ্কা নেই। কাজেই জান্নাতের নেয়ামতরাজি ছিনিয়ে নেয়ার অথবা হ্রাস করে দেয়ারও কোন আশঙ্কা নেই।

          এ দু’টি আয়াতের সারমর্মই হুযুর (সাঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়া অভিশপ্ত এবং যা কিছু এতে আছে তাও অভিশপ্ত; তবে ঐসব বস্তু নয়, যদ্বারা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন করা হয়”।