আলি ইমরান ৬৩-৯১

পৃষ্ঠা নং-১৮৪

আরও আলোচনা করা হবে।

দ্বিতীয় অঙ্গীকার وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে। অঙ্গীকার শুধু আহলে-কিতাব পন্ডিতদের কাছ থেকেই নেয়া হয়েছে, যাতে তারা সত্য গোপন না করে। لِلنَّاسِ

তৃতীয় অঙ্গীকার আলোচ্য আয়াত وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ এ উল্লেখিত হয়েছে। এর বিবরণ পরে আসবে। – (তাফসিরে-আহমাদী)

مِيثَاق এর অর্থ কি এবং তা কোথায় নেয়া হয়েছেঃ এ অঙ্গীকার আত্মার জগতে অথবা পৃথিবীতে ওহীর মাধ্যমে নেয়া হয়েছে। – (বায়ানুল-কুরআন)।

কি অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল, তা করআনেই ব্যক্ত হয়েছে।  কিন্তু কি সম্পর্কে নেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিভিন্নজনের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত রয়েছে।

হযরত আলী ও হযরত ইবনে-আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা সব পয়গম্বরের কাছ থেকে মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে অঙ্গীকার নেন যে, তাঁরা স্বয়ং যদি তাঁর আমলে জীবিত থাকেন, তবে যেন তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং তাঁকে সাহায্য করেন। স্বীয় উম্মতককেও যেন এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে যান।

হযরত তাউস, হাসান বসরী, কাতাদাহ্ প্রমুখ তাফসীরবিদগণ বলেনঃ পয়গম্বরগণের কাছ থেকে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল— যাতে তাঁরা পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন দান করে। – (তাফসীরে ইবনে কাসীর)

নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা শেষোক্ত উক্তির সমর্থন হতে পারে-

وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۖ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا

কেননা, অঙ্গীকার একে অন্যের সাহায্য সমর্থনের জন্য নেয়া হয়েছিল। – (তাফসিরে – আহমদী)

উভয় তাফসীরের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। এ কারণে আয়াতের অর্থ উভয়টিই হতে পারে। – (ইবনে-কাসীর)

মহানবী (সাঃ) -এর বিশ্বজনীন নবুওয়াতঃ  وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা সব পয়গম্বরের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নেন যে, আপনাদের মধ্য থেকে কোন পয়গম্বরের পর যখন অন্য পয়গম্বর আগমন করেন— যিনি অবশ্যই পূর্ববর্তী পয়গম্বর ও খোদায়ী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী হবেন, তখন পূর্ববর্তী নবীর জন্য জরুরী হবে নতুন নবীর সত্যতা ও নবুওয়াতের প্রতি নিজে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং অন্যকেও বিশ্বাস স্থাপন করার নির্দেশ দিয়ে যাওয়া। কুরআনের এ সামগ্রিক নীতির পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কেও এমনি ধরনের অঙ্গীকার পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের কাছ থেকে নিয়ে থাকবেন। আল্লামা সুবকী বলেনঃ এ আয়াতে রাসূল বলে মুহাম্মদ (সাঃ) -কে বোঝানো হয়েছে এবং এমন কোন পয়গম্বর অতিবাহিত হননি, যাঁর কাছ থেকে তাঁর সম্পর্কে অঙ্গীকার নেয়া হয়নি। এমনিভাবে এমন কোন পয়গম্বর অতিবাহিত হননি, যিনি স্বীয় উম্মতকে মুহাম্মদ (সাঃ) -এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে ও সাহায্য সমর্থন করতে নির্দেশ দেননি। যদি মহানবী (সাঃ) সেসব পয়গম্বরের আমলেই আবির্ভূত হতেন, তবে তিনিই সবার নবী হতেন এবং তারা সবাই তাঁর উম্মত হতেন। এতে বোঝা যায় যে, তিনি শুধু নিজের উম্মতেরই নবী নন, নবীগণেরও নবী। এক হাদীসে এরশাদ করেছেন “আজ যদি মূসা (আঃ) জীবিত থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ করা ছাড়া তাঁরও গত্যন্তর ছিল না।”

অন্য এক হাদীসে বলেনঃ যখন ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে অবতরণ করবেন, তখন তিনিও কুরআন এবং তোমাদের নবীর বিধি -বিধানই পালন করবেন। — (তাফসিরে ইবনে-কাসীর)

এতে বোঝা যায় যে, মহানবী (সাঃ)-এর নবুওয়াত বিশ্বজনীন। তাঁর শরীয়তের মধ্যে পূর্ববর্তী সব শরীয়ত পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছে। এ বর্ণনা থেকে بعثت إلى الناس كافة (আমি সমগ্র মানবজাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি।) হাদীসের বিশুদ্ধ অর্থও স্পষ্ঠ হয়ে গেছে। মহানবী (সাঃ)-এর নবুওয়াত শুধু তাঁর আমল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য—হাদীসের এরূপ অর্থ করা ঠিক নয়। বরং তাঁর নবুওয়াতের যামানা এত বিস্তৃত যে, হযরত আদমের নবুওয়াতেরও পূর্ব থেকে এর আরম্ভ।

এক হাদীসে তিনি বলেনঃ আদমের দেহে আত্মা সঞ্চারের পূর্বেই আমি নবী ছিলাম। হাশরের ময়দানে শাফাআতের জন্য অগ্রসর হওয়া, তাঁর পতাকাতলে সমগ্র মানবজাতির একত্রিত হওয়া এবং মি’রাজ-রজনীতে বায়তুল-মুকাদ্দাসে সব পয়গাম্বরের ইমামতি করা তাঁর বিশ্বজনীন নেতৃত্বের অন্যতম লক্ষণ।-