আল-বাকারা ২৫৭-২৭৪

পৃষ্ঠা নং ১৪২

অবসান হতে পারে৷ পুনর্জীবন এবং পরকালীন জীবন সম্পর্কে মুশরিকদের এটাই ছিল বড় প্রশ্ন৷ মানুষ মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যায়, আর এ মাটি বাতাসের সাথে কোথায় কোথায় উড়ে যায়৷ আবার কখনো পানির স্রোতের সাথে গড়িয়ে যায়, কখনো বা বৃক্ষ ও শস্যরূপে আত্মপ্রকাশ করে আবার এর রেণু-কণা, দুর-দুরান্তে ছড়িয়ে পড়ে৷ এ বিক্ষিপ্ত রেণু-কণা একত্রিত করে তাতে প্রাণসঞ্চার করার বিষয়টি সাধারণ জ্ঞাসম্পন্ন লোকদের বোধগম্য হওয়ার কথা নয়৷ সব বিষয়কেই তারা নিজের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের তুলাদন্ডে ওজন করতে চায়৷ তারা তাদের বোধশক্তির বাইরের কোন ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তাও করতে পারে না। অথচ তারা যদি নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কেই একটু চিন্তা করে, তবেই বুঝতে পারবে যে, তাদের অস্তিত্বও সারা বিশ্বের বিক্ষিপ্ত অণু-পরমাণুর একটা সমষ্টি৷

আলোচ্য ঘটনার উপর কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তরঃ আলোচ্য আয়াতে কয়েকটি প্রশ্ন দেখা দেয়৷ প্রথমতঃ হযরত ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম)-এর মনে এ প্রশ্নই বা কেন জেগেছিল? অথচ তিনি আল্লাহ্‌র সর্বময় ক্ষমতার উপর বিশ্বাসীরূপে তৎকালীন বিশ্বে সর্বাধিক দৃঢ় ছিলেন।

এর উত্তর এই যে, প্রকৃতপক্ষে হযরত ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম)-এর প্রশ্ন কোন সন্দেহ-সংশয়ের কারণে ছিল না৷ বরং প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল যে, আল্লাহ্ ত’আলা কিয়ামতে মৃতদেহকে জীবিত করবেন, তা তাঁর সর্বময় ক্ষমতার জন্য কোন আশ্যর্যের বিষয় নয়, কিন্তু মৃতকে জীবিত করা মানুষের শক্তির ঊর্ধ্বে, তারা কখনো কোন মৃতকে জীবিত হতে দেখেনি৷ পরন্তু মৃতকে জীবিত করার পদ্ধতি ও রূপ বিভিন্ন রকম হতে পারে৷ মানুষের স্বভাব হচ্ছে এই যে, যে বস্তু সে দেখেনি তার অনুসন্ধান করার জন্য তার মননে একটা সহজাত কৌতুহল জন্ম নেয়৷ এতে তার ধারণা, বিভিন্ন পথে এগিয়ে যেতে থাকে৷ তাতে চিন্তাজনিত কষ্টও সহ্য করতে হয়৷ এ চিন্তার বিভ্রান্তি থেকে রেহাই পেয়ে অন্তরে স্থিরতা লাভ করাকেই ‘এতমি’নান’ বা প্রশান্তি বলা হয়৷ এই এতমি’নান লাভের উদ্দেশ্যই ছিল হযরত ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম)-এর এ প্রার্থনা৷

এতে একথাও বোঝা যাচ্ছে যে, ঈমান ও এতমি’নান-এর মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে৷ ঈমান সে ইচ্ছাধীন দৃঢ়বিশ্বাসকে বলে, যা মানুষ রসুল (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কথায় কোন অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অর্জন করে৷ আর ‘এতমি’নান’ অন্তরের সে দৃঢ়তাকে বলা হয় যা প্রত্যক্ষ কোন ঘটনা অথবা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে৷ অনেক সময় কোন দৃশ্যমান বিষয়েও দৃঢ়বিশ্বাস জন্মায়, কিন্তু অন্তরের এতমি’নান বা প্রশান্তি লাভ হয় না এজন্য যে, এর স্বরূপ জানা থাকে না৷ এতমি’নান শুধু চাক্ষুষ দর্শনে লাভ হয়৷ হযরত ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম) মৃত্যুর পর পুনর্জীবন সম্পর্কে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী অবশ্যই ছিলেন; তবে প্রশ্নটি ছিল শুধু তার স্বরূপটি জানার জন্য৷

দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, হযরত ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম) মৃতকে জীবিত করার স্বরূপ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন বটে, মৃত্যুর পর পুনর্জীবন সম্পর্কে তাঁর মনে কোনরূপ সন্দেহ ছিল না৷ এমতাবস্থায় আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে أَوَلَمْ تُؤْمِن অর্থাৎ, তুমি কি বিশ্বাস কর না, বলার হেতু কি?

উত্তর এই যে, হযরত ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম) কর্তৃক উত্থাপিত এ প্রশ্নটি দু’ধরনের অর্থ হতে পারে৷

(এক) তিনি জীবিত করার স্বরূপ জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলেন৷ তবে মূল প্রশ্ন অর্থাৎ, মৃত্যুর পর পুনর্জীবন সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন না৷

(দুই) পুনর্জীবিত করার ক্ষমতায় সন্দেহ কিংবা অস্বীকৃতি থেকেও এ প্রশ্ন জন্ম নিতে পারে৷ প্রশ্নের ভাষা এ সম্ভাবনার প্রতিকুল নয়৷ উদাহরণতঃ কোন বোঝা সম্পর্কে আপনার বিশ্বাস এই যে, অমুক ব্যক্তি এটি বহন করতে পারবে না৷ তখন আপনি তার অপারগতা প্রকাশ করার জন্যে বললেনঃ দেখি, তুমি কেমন করে বোঝাটি বহন কর৷ ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম)-এর প্রশ্নের এ ভুল অর্থও কেউ কেউ গ্রহণ করতে পারতো৷ তাই আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত প্রমাণিত করার উদ্দেশে বললেন أَوَلَمْ تُؤْمِن যাতে ইব্‌রাহীম (‘আলাইহিচ্ছালাম) উত্তরে بلى হাঁ, বিশ্বাস করি’ বলে ভুল বোঝার অবকাশ থেকে মুক্ত হয়ে যান৷

আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ  অর্থাৎ, আল্লাহ্ তা‘আলা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়৷ পরাক্রমশালী হওয়ার মধ্যে সর্বশক্তিমানতা বিধৃত হয়েছে; আর প্রজ্ঞাময় বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কোন বিশেষ হেকমতের কারণেই প্রত্যেককে মৃত্যুর পর পুনর্জীবন প্রত্যক্ষ করানো হয় না৷ নতুবা প্রত্যেককে এটা প্রত্যক্ষ করানো আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষে মোটেই কঠিন নয়৷ কিন্তু এতে ‘ঈমান-বিল-গাইব’ তা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করার বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন হয়৷

এটি সূরা বাক্বারার ৩৬ তম রুকূ’, যা ২৬২ নম্বর আয়াত থেকে শুরু হয়৷ এখনও এ সূরার পাঁচটি রুকূ’ বাকী রয়েছে৷ তন্মধ্যে শেষ রুকূ’তে সামগ্রিক ও গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়াদি বর্ণিত হয়েছে৷ এর পূর্ববর্তী চার রুকূ’তে ২৬২ তম আয়াত থেকে ২৮৩ তম আয়াত পর্যন্ত মোট ২১টি আয়াত৷ এগুলোতে অর্থনীতি সংক্রান্ত বিশেষ নির্দেশ ও বক্তব্য পেশ করা হয়েছে৷ এসব নির্দেশ বাস্তবায়িত হলে বর্তমান বিশ্ব যেসব অর্থনৈতিক সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে সেগুলোর সমাধান আপনা-আপনিই বের হয়ে আসবে৷ আজ কোথাও পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং কোথাও এর জবাবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তিত রয়েছে৷ এসব নীতির পারস্পরিক সংঘাতের ফলে গোটা বিশ্ব মারামরি, কাটাকাটি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের উত্তপ্ত লাভায় পরিপূর্ণ হয়ে আগ্নেয়গিরির রূপ ধারণ করেছে৷ এসব আয়াতে ইসলামী অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বর্ণিত হয়েছে৷ এটি দু’ভাগে বিভক্তঃ

(১) প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্যে অভাবগ্রস্ত, দীন-দুঃখীদের জন্যে ব্যয় করার শিক্ষা, –একে সদাকা ও খয়রাত বলা হয়৷

(২) সুদের লেন-দেনকে ‘হারাম করে তা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ৷

প্রথম দু’রুকূ’তে দান-খয়রাতের ফযীলত, তৎপ্রতি উৎসাহদান এবং তৎসম্পর্কিত বিধানাবলী বর্ণিত হয়েছে এবং শেষ দু’রুকূ’তে সুদভিত্তিক কারবারের অবৈধতা, নিষেধাজ্ঞা এবং ঋণদানের বৈধ পন্থার বর্ণনা রয়েছে৷

আলোচ্য আয়াতসমুহের প্রথম আয়াতে আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে৷ এরপর দান-খয়রাত আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য শর্তাবলী উল্লেখ করা হয়েছে৷ অতঃপর এমন কতিপয় বিষয় বর্ণিত হয়েছে, যা দান-খয়রাতকে বরবাদ ও নিস্ফল প্রয়াসে পরিণত করে৷

এরপর বর্ণনা করা হয়েছে দু’টি উদাহরণ৷ একটি আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণীয় দান খয়রাতের এবং অপরটি অগ্রহণীয় ও ফাসেদ দান-খয়রাতের৷

এ রুকূতে এ পাঁচটি বিষয়বস্তু উল্লেখিত হয়েছে৷

এসব বিষয়বস্তুর পূর্বে জানা দরকার যে, আল্লাহ্‌র পথে অর্থ ব্যয়-