আল-বাকারা ২৫৭-২৭৪

পৃষ্ঠা নং-১৪৩

করাকে কুরআন পাক কোথাও انفاق  শব্দে, কোথাও اطعام  শব্দে, কোথাও صدقه  শব্দে এবং কোথাও ايتآء الزكوة  শব্দে ব্যক্ত করেছে৷ কুরআনের এসব শব্দ এবং বিভিন্ন স্থানে এগুলোর ব্যবহারের প্রতি লক্ষ্য করলে জানা যায় যে, صدقه – انفاق- اطعام  প্রভৃতি শব্দগুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সর্বপ্রকার দান-খয়রাত ও ব্যয়কেই বোঝায়; তা ফরয, ওয়াজীব, কিংবা নফল, মুস্তা‘হাব যাই হোক৷ ফরয যাকাত বোঝাবার জন্যে কুরআন একটি স্বতন্ত্র শব্দ ايتآء الزكوة  ব্যবহার করেছে এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ বিশেষ সদাকাটি আদায় করা ও ব্যয় করার মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে৷

এ রুকু’তে বেশীর ভাগ انفاق  শব্দ এবং কোথাও صدقه  শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থ এই যে, এখানে সাধারণ দান-খয়রাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে৷

وَمَثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُمُ ٱبۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ ٱللَّهِ وَتَثۡبِيتٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ كَمَثَلِ جَنَّةِۢ بِرَبۡوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٞ فَ‍َٔاتَتۡ أُكُلَهَا ضِعۡفَيۡنِ فَإِن لَّمۡ يُصِبۡهَا وَابِلٞ فَطَلّٞۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٌ ٢٦٥

২৬৫.যারা আল্লাহ্‌র রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের মত, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়; অতঃপর দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি এমন প্রবল বৃষ্টিপাত নাও হয়, তবে হাল্কা বর্ষণই যথেষ্ট। আল্লাহ্‌ তোমাদের কাজকর্ম যথার্থই প্রত্যক্ষ করেন।

أَيَوَدُّ أَحَدُكُمۡ أَن تَكُونَ لَهُۥ جَنَّةٞ مِّن نَّخِيلٖ وَأَعۡنَابٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ لَهُۥ فِيهَا مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ وَأَصَابَهُ ٱلۡكِبَرُ وَلَهُۥ ذُرِّيَّةٞ ضُعَفَآءُ فَأَصَابَهَآ إِعۡصَارٞ فِيهِ نَارٞ فَٱحۡتَرَقَتۡۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمُ ٱلۡأٓيَٰتِ لَعَلَّكُمۡ تَتَفَكَّرُونَ ٢٦٦

২৬৬.তোমাদের কেউ পছন্দ করে যে, তার একটি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান হবে, এর তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হবে, আর এতে সর্বপ্রকার ফল-ফসল থাকবে এবং সে বার্ধক্যে পৌছবে, তার দুর্বল সন্তান সন্ততিও থাকবে, এমতাবস্থায় এ বাগানের একটি ঘূর্ণিবায়ু আসবে, যাতে আগুন রয়েছে, অনন্তর বাগানটি ভষ্মীভূত হয়ে যাবে? এমনিভাবে আল্লাহ্‌ তা‘আলা তোমাদের জন্যে নিদর্শনসমূহ বর্ননা করেন-যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَنفِقُواْ مِن طَيِّبَٰتِ مَا كَسَبۡتُمۡ وَمِمَّآ أَخۡرَجۡنَا لَكُم مِّنَ ٱلۡأَرۡضِۖ وَلَا تَيَمَّمُواْ ٱلۡخَبِيثَ مِنۡهُ تُنفِقُونَ وَلَسۡتُم بِ‍َٔاخِذِيهِ إِلَّآ أَن تُغۡمِضُواْ فِيهِۚ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ ٢٦٧

২৬৭.হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা, তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ্‌ অভাব মুক্ত, প্রশংসিত।

ٱلشَّيۡطَٰنُ يَعِدُكُمُ ٱلۡفَقۡرَ وَيَأۡمُرُكُم بِٱلۡفَحۡشَآءِۖ وَٱللَّهُ يَعِدُكُم مَّغۡفِرَةٗ مِّنۡهُ وَفَضۡلٗاۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٞ ٢٦٨

২৬৮.শয়তান তোমাদেরকে অভাব অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও বেশী অনুগ্রহের ওয়াদা করেন। আল্লাহ্‌ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।

يُؤۡتِي ٱلۡحِكۡمَةَ مَن يَشَآءُۚ وَمَن يُؤۡتَ ٱلۡحِكۡمَةَ فَقَدۡ أُوتِيَ خَيۡرٗا كَثِيرٗاۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّآ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ٢٦٩

২৬৯.তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ জ্ঞান দান করেন এবং যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়, সে প্রভুত কল্যাণকর বস্তু প্রাপ্ত হয়। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান।

আনুষঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ

আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করার একটি দৃষ্টান্তঃ প্রথম আয়াতে বলা হয়েছেঃ যারা আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করে, —অর্থাৎ, হজ্ব, জিহাদ কিংবা ফকীর, মিসকীন, বিধবা ও ইয়াতিমদের জন্যে কিংবা সাহায্যের নিয়তে আত্মীয়-স্বজনদের জন্যে অর্থ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত এমন যেমন, কেউ গমের একটি দানা সরস জমিতে বপন করল৷ এ দানা থেকে একটি চারা গাছ উৎপন্ন হল, যাতে গমের সাতটি শীষ এবং প্রত্যেকটি শীষে একশ’ করে দানা থাকবে৷ অতএব, এর ফল দাঁড়ালো এই যে, একটি দানা থেকে সাতশ’ দানা অর্জিত হয়ে গেল৷

উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করার সওয়াব এক থেকে শুরু করে সাতশ’ পর্যন্ত পৌঁছে৷ এক পয়সা ব্যয় করলে সাতশ’ পয়সার সওয়াব অর্জিত হতে পারে৷

স‘হীহ ও নির্ভরযোগ্য ‘হাদীসসমূহে বর্ণিত আছে, একটি সৎকর্মের সওয়াব দশগুণ পাওয়া যায় এবং তা সাতশ’ গুণে পৌঁছে৷

দান গ্রহণীয় হওয়ার শর্তাবলীঃ কিন্তু কুরআন পাক এ বিষয়বস্তুটি সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার ভাষায় বর্ণনা করার পরিবর্তে গম-বীজের দৃষ্টান্তের আকারে বর্ণনা করেছে৷ এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, কৃষক গমের এক দানা থেকে সাতশ’ দানা তখনই পেতে পারে, যখন দানাটি হবে উৎকৃষ্ট৷ কৃষকও কৃষি বিষয়ে ওয়াকেফহাল হবে এবং জমিও হবে সরস৷ কেননা, এ তিনটির যেকোন একটি বিষয়ে অভাব হলেও হয় দানা বেকার হয়ে যাবে অর্থাৎ, একটি দানাও উৎপন্ন হবে না, কিংবা এক দানা থেকে সাতশ’ দানার মত ফলনশীল হবে না৷

এমনিভাবে সাধারণ সৎকর্ম এবং বিশেষ করে আল্লাহ্‌র পথে কৃত ব্যয় গ্রহণীয় ও অধিক সওয়াব পাওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে৷

(১) পবিত্র ও ‘হালাল ধন-সম্পদ আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করা৷ ‘হাদীসে আছে, আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র ও ‘হালাল বস্তু ছাড়া কোন কিছুই গ্রহণ করেন না।

(২) যে ব্যয় করবে তাকেও সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত ও সৎ হতে হবে৷ কোন খারাপ নিয়তে কিংবা নাম-যশ অর্জনের উদ্দেশে যে ব্যয় করে, সে ঐ অজ্ঞ কৃষক সদৃশ, যে বীজকে অনুর্বর মাটিতে বপন করে, ফলে তা নষ্ট হয়ে যায়৷

(৩) যার জন্য ব্যয় করবে, তাকেও সদাকার যোগ্য হতে হবে৷ অযোগ্য ব্যক্তির জন্যে ব্যয় করলে সদাকা ব্যর্থ হবে৷ এভাবে বর্ণিত দৃষ্টান্ত দ্বারা আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করার ফযীলতও জানা গেল এবং সাথে সাথে তিনটি শর্তও জানা গেল যে, ‘হালাল ধন-সম্পদ ব্যয় করতে হবে, ব্যয়-