আল-বাকারা ২৫৭-২৭৪

পৃষ্ঠা নং-১৪৪

করার রীতিও সুন্নাত অনুযায়ী হতে হবে এবং যোগ্য ব্যক্তির প্রতি ব্যয় করতে হবে। শুধু পকেট থেকে বের করে দিয়ে দিলেই এ ফযীলত অর্জিত হবে না।

দ্বিতীয় আয়াতে দান-খয়রাতের নির্ভুল ও সুন্নত তরীকা বর্ণনা করে বলা হয়েছেঃ যারা আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করে এবং ব্যয় করার পর অনুগ্রহ প্রকাশ করে না এবং যাকে দান করে, তাকে কষ্ট দেয় না, তাদের সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য তাদের কোন বিপদাশঙ্কা নেই এবং অতীতের ব্যাপারেও তাদের কোন চিন্তা নেই।

সদকা গ্রহনীয় হওয়ার সর্তাবলীঃ এ আয়াতে সদাকা কবুল হওয়ার জন্যে দু’টি শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

(১) দান করে অনুগ্রহ প্রকাশ করতে পারবে না এবং

(২) গ্রহীতাকে ঘৃণিত মনে করা যাবে না। অর্থাৎ তার সাথে এমন কোন ব্যবহার করতে পারবে না যাতে সে নিজেকে ঘৃণিত ও হেয় অনুভব করে কিংবা কষ্ট পায়।

তৃতীয় আয়াতে قَوْلٌ مَّعْرُوفٌ  অর্থাৎ, সদাকা-খয়রাত গ্রহণীয় হওয়ার জন্য পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত দু’টি শর্তের আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে । প্রথমতঃ আল্লাহ্‌র পথে ধন-সম্পদ ব্যয় করে কারও প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করতে পারবে না এবং দ্বিতীয়তঃ যাকে দান করা হবে তার সাথে এমন কোন ব্যবহার করা যাবে না, যাতে সে নিজেকে ঘৃণিত ও হেয় অনুভব করে কিংবা কষ্ট পায়।

ব্যাখ্যা এভাবে করা হয়েছে যে, আর্থিক অক্ষমতা কিংবা ‘উযরের সময় যাঞ্চাকারীর জওয়াবে কোন যুক্তিুযুক্ত ও সঙ্গত অজুহাত বলে দেয়া এবং যাঞ্চাকারী অশোভন আচরণ করে রাগান্বিত করলে তাকে ক্ষমা করা বহুগুণে শ্রেয়ঃ সে দান খয়রাতের চাইতে যার পর দান গ্রহীতাকে কষ্ট দেয়া হয়। আল্লাহ্ তা‘আলা স্বয়ং সম্পদশালী ও সহিঞ্চু। তিনি কারও অর্থের মুখাপেক্ষী নন। যে ব্যক্তি ব্যয় করে, সে নিজের উপকারের জন্যই করে। অতএব, ব্যয় করার সময় প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তির লক্ষ্য রাখা উচিত যে, কারও প্রতি তার অনুগ্রহ নেই, নিজের উপকারের জন্যই সে ব্যয় করছে। দান গ্রহীতার পক্ষ থেকে কোনরূপ অকৃতজ্ঞতা অনুভব করলেও তাকে খোদায়ী রীতির অনুসারী হয়ে ক্ষমা করা দরকার।

চতুর্থ আয়াতে এ বিষয়বস্তুটিই অন্যভাবে আরও তাকীদসহ বর্ণনা করে বলা হয়েছে, মুখে অনুগ্রহ প্রকাশ করে কিংবা আচার-আচরণের মাধ্যমে গ্রহীতাকে কষ্ট দিয়ে নিজের দান-খয়রাতকে বরবাদ করো না।

এতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, যে দান-খয়রাতের পর অনুগ্রহ প্রকাশ কিংবা গ্রহীতাকে কষ্ট দেয়ার মত কোন কাজ করা হয়, তা বাতিল এবং না করার শামিল। এরূপ দান-খয়রাতে কোন সওয়াব নেই। এ আয়াতে দান কবুল হওয়ার আরও একটি শর্ত বর্ণনা করে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি লোক-দেখানো ও নাম-যশের উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ্ ও কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস রাখে না, তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন মসৃণ পাথরের উপর মাটি জমে যায় এবং তাতে কেউ বীজ বপন করে। অতঃপর এর ‍উপর মুষলধারে বারিপাত হয়। ফলে মাটি কেটে গিয়ে পাথরটি সম্পূর্ণ মসৃণ হয়ে যায়। এরূপ লোক স্বীয় উপার্জন হস্তগত করতে সক্ষম হবে না এবং আল্লাহ্ তা‘আলা কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন না। এতে সদাকা-খয়রাত কবুল হওয়ার এ শর্ত জানা গেল যে, নির্ভেজালভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি এবং পরকালের সওয়াবের নিয়তে ব্যয় করতে হবে- লোকদেখানো কিংবা নাম-যশের নিয়ত করা যাবে না। নাম-যশের নিয়তে ব্যয় করা ধন-সম্পদের জলাঞ্জলি দেয়ারই নামান্তর। যদি পরকালে বিশ্বাসী মু’মিনও নাম-যশের উদ্দেশ্যে কোন দান-খয়রাত করে, তবে তার অবস্থাও তদ্রূপ হবে এবং বিনিময়ে কোন সওয়াবই সে পাবে না। এমতাবস্থায় এখানে لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ যোগ করে সম্ভবতঃ ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, লোক-দেখানো ও নাম-যশের উদ্দেশ্যে কাজ করা আল্লাহ্ তা‘আলা ও কিয়ামতে বিশ্বাসী ব্যক্তির পক্ষে অকল্পনীয়। লোকদেখানো কাজ করা বিশ্বাসে ক্রটিরই লক্ষণ।

আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ্ তা‘আলা কৃতঘ্ন-কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন না। এর তাৎপর্য এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলার হিদায়াত ও আয়াত সব মানুষের জন্যেই প্রেরিত হয়েছে। কিন্তু কাফেররা এ সবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বরং ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এর পরিণতিতে আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে তাওফীক তথা সৎকাজের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে দেন। ফলে তারা কোন হিদায়াত কবুল করতে পারে না।

পঞ্চম আয়াতে গ্রহণযোগ্য দান-খয়রাতের একটি উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে। যারা স্বীয় ধন-সম্পদকে মনে দৃঢ়তা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়্যতে ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ কোন টিলায় অবস্থিত বাগানের মত। প্রবল বৃষ্টিপাত না হলেও হাল্কা বারিবর্ষণই যার জন্যে যথেষ্ট। আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে খুব পরিজ্ঞাত।

এ উদাহরণের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, খাঁটি নিয়্যত ও উপরোক্ত শর্তাবলীর প্রতি লক্ষ্য রেখে আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করলেও তা যথেষ্ট এবং পারলৌকিক সাফল্যের কারণ।

ষষ্ঠ আয়াতে উপরোক্ত শর্তাবলীর বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে দান-খয়রাত বাতিল ও প্রত্যাখাত হওয়ার বিষয়টিও একটি উদাহরণ দ্বারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ তোমাদের কেউ পছন্দ করবে কি যে, তার একটি আঙ্গুর ও খেজুরের বাগান হবে, বাগানের নীচ দিয়ে পানির নহরসমূহ প্রবাহিত হবে, বাগানে সব রকম ফল থাকবে, সে নিজে বৃদ্ধ হয়ে যাবে এবং তার দুর্বল ও শক্তিহীন ছেলে সন্তানও বর্তমান থাকবে, এমতাবস্থায় বাগানে দাবানল আঘাত হানবে এবং বাগানটি জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে? আল্লাহ্ তা‘আলা এমনিভাবে তোমাদের জন্যে নজীর বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর।

এ উদাহরণে কয়েকটি অতিরিক্ত শর্ত যোগ করা হয়েছেঃ অর্থাৎ, সে বৃদ্ধ হয়ে গেল, তার সন্তান-সন্ততিও আছে এবং সন্তানগুলো অল্পবয়স্ক; ফলে দুর্বল ও শক্তিহীন। এসব শর্তের উদ্দেশ্য এই যে, যৌবনে কারও বাগান ও শস্যক্ষেত্র জ্বলে গেলে সে পুনরায় বাগান করে নেয়ার আশা করতে পারে, কিংবা যার সন্তান-সন্ততি নেই এবং পুনরায় বাগান করে নেয়ার আশাও নেই, বাগান জ্বলে যাওয়ার পরও তার পক্ষে জীবিকার ব্যাপারে তেমন চিন্তিত হওয়ার কথা নয়। একটিমাত্র লোকের ভরণ-পোষণ, কষ্টে-সৃষ্টে হলেও চলে যায়। পক্ষান্তুরে যদি সন্তান-সন্ততিও থাকে এবং পিতার কাছে সহযোগিতা ও সাহায্য করার মত বলিষ্ট যুবক ও সৎসন্তান-সন্ততি থাকে, তবুও বাগান ধ্বংস হওয়ার দরুন তেমন বেশী চিন্তা ও ব্যথার কারণ নেই। কেননা, সে সন্তান-সন্ততির চিন্তা থেকে মুক্ত। বরং সন্তানেরা তার বোঝাও বহন করতে সক্ষম। মোটকথা এ তিনটি শর্তই মুখাপেক্ষিতার তীব্রতা বর্ণনা করার জন্যে যোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বাগান করলো, বাগান তৈরী হয়ে ফলও দিতে লাগলো, এমতাবস্থায় সে বৃদ্ধ হয়ে পড়লো। তার সন্তান-সন্ততিও বর্তমান এবং সন্তানগুলো অল্প বয়স্ক ও দুর্বল। এহেন মুহুর্তে যদি তৈরী-বাগান জ্বলে-পুড়ে ধ্বংস হয়ে ‍যায়, তবে তীব্র আঘাত ও অপরিসীম কষ্টেরই কথা।