আল-বাকারা ২৫৭-২৭৪

পৃষ্ঠা নং-১৪৫

পূর্ণ আয়াতের সারমর্ম এই যে, সদাকা ও খয়রাত আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণীয় হওয়ার একটি প্রধান শর্ত হচ্ছে ইখলাস। অর্থাৎ, খাঁটি নিয়্যতে ও অন্তরে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্যেই ব্যয় করতে হবে; নাম-যশের উদ্দেশ্যে নয়।

এখন সমগ্র রুকু’র সবগুলো আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করলে আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় ও সদাকা-খয়রাত গ্রহণীয় হওয়ার জন্য ছয়টি শর্ত জানা যাবে।

প্রথমতঃ যে ধন-সম্পদ আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করা হয়, তা ‘হালাল হতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ সুন্নাহ অনুযায়ী ব্যয় করতে হবে।

তৃতীয়তঃ বিশুদ্ধ খাতে ব্যয় করতে হবে।

চতুর্থতঃ খয়রাত দিয়ে অনুগ্রহ প্রকাশ করা যাবে না।

পঞ্চমতঃ যাকে দান করা হবে, তার সাথে এমন ব্যবহার করা যাবে না। যাতে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

ষষ্ঠতঃ যা কিছু ব্যয় করা হবে, খাঁটি নিয়্যতের সাথে এবং আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে- নাম-যশের জন্যে নয়।

দ্বিতীয় শর্ত, অর্থাৎ, সুন্নাহ অনুযায়ী ব্যয় করার অর্থ এই যে, আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করার সময় কোন হকদারের হক যাতে নষ্ট না হয়, তার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। স্বীয় পোষ্যদের প্রয়োজনীয় খরচাদি তাদের অনুমতি ছাড়া বন্ধ অথবা হ্রাস করে দান-খয়রাত করা কোন সওয়াবের কাজ নয়। অভাবগ্রস্ত ওয়ারিসদেরকে বঞ্চিত করে সব ধন-সম্পদ খয়রাত করা কিংবা ওয়াক্‌ফ্ করে দেয়া সুন্নাহ্‌র শিক্ষার পরিপন্থি। এ ছাড়া আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করার হাজারো পন্থা রয়েছে।

সুন্নত দান এই যে, গুরুত্ব ও প্রয়োজনের  তীব্রতার দিকে লক্ষ্য রেখে খাত নির্বাচন করতে হবে। ব্যয়কারীরা সাধারণতঃ এ দিকে লক্ষ্য রাখে না।

তৃতীয় শর্তের সারমর্ম এই যে, নিজ ধারণা মতে কোন কাজকে সৎকাজ মনে করে সেই খাতে ব্যয় করাই সওয়াব হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়; বরং খাতটি শরী‘আতের বিচারে বৈধ ও পছন্দনীয় কিনা, তা দেখাও জরুরী। যদি কেউ অবৈধ খেলাধূলার জন্যে স্বীয় সহায় সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ্ করে দেয়, তবে সে সওয়াবের পরিবর্তে ‘আযাবের যোগ্য হবে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে পছন্দনীয় নয়- এমন সব কাজের বেলায় এ কথাই প্রযোজ্য।

পূর্ববর্তী রুকু’তে আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করার বর্ণনা ছিল। এখন এর সাথেই সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি আলোচ্য রুকু’র সাতটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, এর বিবরণ নিম্নরূপঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ وَلَسْتُم بِآخِذِيهِ إِلَّا أَن تُغْمِضُوا فِيهِ ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ

শানে-নুযূল দৃষ্টে طيب শব্দের অর্থ করা হয়েছে ‘উৎকৃষ্ট’। কেউ কেউ দান করার জন্যে নিকৃষ্ট বস্তু নিয়ে আসত। এর পরিপ্রেক্ষিতেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। কোন কোন তাফসীরকার শব্দের ব্যাপকতা দৃষ্টে এর অর্থ করেছেন ‘হালাল’। কেননা, মাল পুর্ণরূপে উৎকৃষ্ট তখনই হয়, যখন তা ‘হালালও হয়। এ তাফসীর অনুযায়ী আয়াতে ‘হালালেরও তাকীদ হবে। তবে প্রথমোক্ত তাফসীর অনুযায়ী অন্যান্য প্রমাণ দ্বারা এও প্রমাণিত হয় যে, খয়রাতের মাল ‘হালাল এবং উৎকৃষ্ট দু’টোই হওয়া শর্ত। মনে রাখা দরকার যে, আয়াতে উৎকৃষ্ট মাল দেয়ার নির্দেশ ঐ ব্যক্তির জন্যে, যার কাছে উৎকৃষ্ট বস্তু থাকা সত্ত্বেও মন্দ ও নিকৃষ্ট বস্তু আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করে। مَا كَسَبْتُمْ এবং أَخْرَجْنَا শব্দ, দ্বারা বোঝা যায় যে, উৎকৃষ্ট বস্তু বিদ্যমান রয়েছে। আর وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ বাক্য দ্বারা বোঝা যায় যে, সে ইচ্ছাকৃতভাবে অকেজো জিনিষ ব্যয় করে। পক্ষান্তরে যার কাছে মুলতঃই উৎকৃষ্ট বস্তু নেই, সে এ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। সে নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করলেও গ্রহণীয় হবে।

مَا كَسَبْتُمْ  শব্দ থেকে কোন কোন আলেম মাসআলা চয়ন করেছেন যে, পিতা পুত্রের উপার্জন ভোগ করতে পারে, এটা জায়েয। কেননা, মহানবী (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,- তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের উপার্জনের একটি পুতঃপবিত্র অংশ। অতএব, তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে সন্তান-সন্ততির উপার্জন ভক্ষণ কর।–(কুরতুবী)

শষ্য ক্ষেত্রের ‘উশর-বিধিঃ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ  বাক্যে  أَخْرَجْنَا  শব্দ দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ‘উশরী জমিতে (যে যমীনের উৎপন্ন শস্যের এক-দশমাংশ ইসলামী বিধান অনুযায়ী সরকারী তহবিলে জমা দিতে হয়) যে ফসল উৎপন্ন হয়, তার এক-দশমাংশ দান করা ওয়াজিব। আয়াতের ব্যাপকতাদৃষ্টে ইমাম আবূ ‘হানীফা (র‘হিমাহুল্ল-হ) বলেন যে, ‘উশরী জমীতে ফসল অল্প হোক বা বেশী হোক ‘উশর দেয়া ওয়াজিব। সুরা আন‘আমের وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ ۖ  আয়াতটি ‘উশর ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশসূচক।

‘উশর’ ও ‘খিরাজ’ ইসলামী শরী‘আতের দু’টি পারিভাষিক শব্দ। এ দু’য়ের মধ্যে একটি বিষয় অভিন্ন। উভয়টিই ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভূমির উপর আরোপিত কর। পার্থক্য এই যে, ‘উশর’ শুধু কর নয়, এতে আর্থিক ‘ইবাদতের দিকটিই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ; যেমন- যাকাত। একারণেই ‘উশরকে ‘যাকাতুল-‘আরদ’ বা ভুমির যাকাতও বলা হয়। পক্ষান্তরে খিরাজ শুধু করকে বোঝায়। এতে ‘ইবাদতের কোন দিক নেই। মুসলমানরা ‘ইবাদতের যোগ্য ও অনুসারী। তাই তাদের কাছ থেকে ভুমির উৎপন্ন ফসলের যে অংশ নেয়া হয়, তাকে ‘উশর’ বলা হয়। অ-মুসলিমরা ‘ইবাদতের যোগ্য নয়। তাই তাদের ভূমির উপর যে কর ধার্য করা হয়, তাকে ‘খিরাজ’ বলা হয়। যাকাত ও ‘উশরের মধ্যে কার্যতঃ আরও পার্থক্য এই যে, স্বর্ণ, রোপ্য ও পন্য সামগ্রির উপর বছরান্তে যাকাত ওয়াজিব হয়, কিন্তু ‘উশরী জমিনে উৎপাদনের সাথে সাথেই ‘উশর ওয়াজিব হয়ে যায়।

দ্বিতীয় পার্থক্য এই যে, জমিনে ফসল উৎপন্ন না হলে ‘উশর দিতে হয়না। কিন্তু পণ্যদ্রব্য ও স্বর্ণ-রৌপ্যে মুনাফা না হলেও বছরান্তে যাকাত ফরয হবে। ‘উশর ও খিরাজের বিস্তারিত ফেকাহ গ্রন্থসমূহে দ্রষ্টব্য।

الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ…………..وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ

যখন কারও মনে এ ধারণা জন্মে যে, দান-খয়রাত করলে ফকীর হয়ে যাবে, বিশেষতঃ আল্লাহ্ তা‘আলার তাকীদ শুনেও স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করার সাহস না হয় এবং খোদায়ী ওয়াদা থেকে মুখ ফিরিয়ে শয়তানী ওয়াদার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন বুঝে নেয়া উচিত যে, এ প্ররোচনা শয়তানের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। এখানে এরূপ বলা ঠিক নয় যে, আমরা তো শয়তানের চেহারাও দেখিনি- প্ররোচনা ও নির্দেশ নেয়া দুরের কথা পক্ষান্তরে যদি মনে ধারণা জন্মে যে, সদাকা-খয়রাত করলে গোনাহ্ মাফ হবে এবং ধন-সম্পত্তিও বৃদ্ধি পাবে ও বরকত হবে, তখন মনে করতে হবে, এ বিষয়টি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে। এমতাবস্থায় আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। আল্লাহ্‌র ভান্ডারে কোন কিছুর অভাব নেই। তিনি সবার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং নিয়্যত ও কর্ম সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।