আল-বাকারা ২৫৭-২৭৪

পৃষ্ঠা নং-১৪৭

মানত সম্পর্কেই পরিজ্ঞাত৷ তিনি এগুলোর প্রতিদানও দেবেন৷ সীমা ও শর্তাবলীর প্রতি লক্ষ্য রাখতে উৎসাহিত করা এবং লক্ষ্য না রাখার জন্য ভীতি-প্রদর্শন করার লক্ষ্যেই একথা শোনান হয়েছে৷ পক্ষান্তরে যারা প্রয়োজনীয় শর্তাবলীর প্রতি লক্ষ্য রাখে না, তাদেরকে স্পষ্টভাবে শাস্তিবাণী শুনিয়ে দেয়া হয়েছে৷

إِن تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ ۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ وَيُكَفِّرُ عَنكُم مِّن سَيِّئَاتِكُمْ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

বাহ্যতঃ এ আয়াতে ফরয ও নফল সব রকম দান-খয়রাতকে অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়েছে যে, সর্বপ্রকার দানের ক্ষেত্রে গোপনীয়তাই উত্তম৷ এতে ধর্মীয় ও বৈষয়িক উভয় প্রকার উপকারিতাই বর্তমান৷ ধর্মীয় উপকারিতা এই যে, এতে রিয়া তথা লোক দেখানোর সম্ভাবনা নেই এবং দান গ্রহণকারীও লজ্জিত হয় না৷ বৈষয়িক উপকারিতা এই যে, স্বীয় অর্থের পরিমাণ সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ে না৷ গোপনীয়তা উত্তম হওয়ার মানে স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে উত্তম হওয়া৷ সুতরাং অপবাদ খন্ডন করা, অন্যে তা অনুসরণ করবে এরূপ আশা করা ইত্যাদি কারণে যদি কোন ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে দান করা উত্তম বিবেচিত হয়, তবে তা এর পরিপন্থী নয়৷

وَيُكَفِّرُ عَنكُم مِّن سَيِّئَاتِكُمْ ۗ  গোপনে দান করার সাথেই গোনাহ্‌র কাফ্ফারাও সম্পর্কযুক্ত নয়- শুধু এ বিষয়ে সতর্ক করার জন্যে গোপনীয়তার পার্শ্বে একে উল্লেখ করা হয়েছে৷ অর্থাৎ, গোপন দান করার মধ্যে যদি তুমি কোন বাহ্যিক উপকার না দেখ, তবে বিষন্ন হওয়া উচিত নয়৷ কেননা, তোমার গোনাহ্ আল্লাহ্ মাফ করবেন৷ এটা তোমার বিরাট উপকার৷

لَّيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ۗ وَمَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَلِأَنفُسِكُمْ ۚ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ ۚ وَمَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ

এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, দান-খয়রাতে আসলে তোমাদের নিয়্যতও থাকে নিজেদেরই উপকার লাভ করা এবং বাস্তবেও এর দ্বারা বিশেষভাবে তোমাদেরই উপকার হবে৷ এমতাবস্থায় দান-খয়রাত করলে তা শুধুমাত্র মুসলমানকেই দেবে- কাফেরকে দেবে না, এ বিশেষ পথে এ উপকার লাভ করতে চাও কেন? এটি অতিরিক্ত বিষয়৷ এর প্রতি লক্ষ্য করা উচিত নয়৷

এখানে আরও বুঝে নেয়া দরকার যে, এ সদাকা অর্থ নফল সদাকা, যা যিম্মী কাফেরকেও দেয়া জায়েয৷ এখানে সদাকা বলতে ফরয সদাকা বোঝান হয়নি৷ ফরয সদাকা মুসলমান ছাড়া কাউকে দেয়া জায়েয নয়৷ – (মাযহারী)

মাসআলাঃ দারুল- ‘হারবের (বিধর্মীদের শাসনাধীন রাষ্ট্র) কাফেরদেরকে কোন প্রকার দান-খয়রাত দেয়া জায়েয নয়৷

মাসআলাঃ যিম্মী কাফের অর্থাৎ, যে দারুল-‘হারবের নয়, তাকে শুধু যাকাত/যাকাহ ও ‘উশর (জমীর উৎপাদন থেকে) দান করা জায়েয নয়, অন্যান্য সব ওয়াজিব ও নফল সোকা দান করা জায়েয৷ আলোচ্য আয়াতে যাকাত অন্তর্ভুক্ত নয়৷

لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا ۗ وَمَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ.

এখানে ফকীর বলতে ঐ সকল লোককে বোঝান হয়েছে, যারা ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে জীবিকা অর্জনের উদ্দেশ্যে অন্য কোন কাজ করতে পারে না৷

يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ  এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, কোন ফকীরকে যদি মুল্যবান পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়, তবে এ কারণে তাকে ধনী মনে করা হবে না; বরং ফকীরই বলা হবে৷ এরূপ ব্যক্তিকে যাকাত দান করাও দুরস্ত/স্বঠিক হবে৷ (কুরতুবী)

تعرفهم بسيمهم এতে বোঝা যায় যে, লক্ষণাদি দেখে বিচার করা অশুদ্ধ নয়৷ কাজেই যদি এমন কোন বেওয়ারিস মৃতদেহ পাওয়া যায়, যার দেহে পৈতা আছে এবং সে খতনাকৃতও নয়, তবে তাকে মুসলমানদের গোরস্থানে দাফন করা যাবে না৷ -(কুরতুবী)

لايسئلون الناس الحافا এ আয়াত থেকে বাহ্যতঃ জানা যায় যে, তারা পথ আগলিয়ে সওয়াল করে না৷ কিন্তু পথ না আগলিয়েও সওয়াল করে না-এরূপ বোঝা যায় না৷ কোন কোন তাফসীরকার তাই বলেছেন৷ কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরকারদের মতে এর অর্থ এই যে, তারা মোটেই সওয়াল করে না৷ لانهم متعففون عن المسألة عفة تامة কারণ, তারা সওয়াল করা থেকে নিজেদেরকে পুরোপুরি নিরাপদ দুরত্বে রাখে৷ -(কুরতুবী)

الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُم بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ এ সপ্তম আয়াতে ঐ সকল লোকের বিরাট প্রতিদান ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে, যারা আল্লাহ্‌র পথে ব্যয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে৷ তারা রাত্রে-দিনে, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সবসময় ও সর্বাবস্থায় আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করতে থাকে৷ এ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে যে, দান-খয়রাতের জন্যে কোন সময় নির্দিষ্ট নেই, দিবারাত্রিরও কোন প্রভেদ নেই৷ এমনিভাবে গোপনে ও প্রকাশ্যে উভয় প্রকারে আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করলে সওয়াব পাওয়া যায়৷ তবে শর্ত এই যে, খাঁটি নিয়্যতে দান করতে হবে৷ নাম-যশের নিয়্যত থাকলে চলবে না৷ প্রকাশ্যে ব্যয় করার কোন প্রয়োজন দেখা না দেয়া পর্যন্তই গোপনে দান করার শ্রেষ্ঠত্ব সীমাবদ্ধ৷ যেখানে এরূপ প্রয়োজন দেখা দেয়, সেখানে প্রকাশ্যে দান করাই শ্রেয়৷

ইবনে-‘আসাকের-এর বরাত দিয়ে রু‘হুল-মা’আনীতে বর্ণীত আছে যে, হযরত আবূ বাক্‌র সিদ্দীক (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু) একবার দশ হাজার দেরহাম দিনে, দশ হাজার দেরহাম রাত্রে, দশ হাজার দেরহাম গোপনে ও দশ হাজার দেরহাম প্রকাশ্যে, এভাবে মোট চল্লিশ হাজার দেরহাম আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করেন৷ কোন কোন তাফসীরকার হযরত আবূ বাক্‌র (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-এর এ ঘটনাকে আয়াতের শানে-নুযূল (অবতরণের স্থান) হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ অবশ্য এ আয়াতের শানে-নুযূল সম্পর্কে আরও বিভিন্ন উক্তি রয়েছে৷